You are currently viewing কন্টেন্ট মার্কেটিং কি? কন্টেন্ট মার্কেটিং কেন প্রয়োজন?

তাহসিন প্রতিদিনকার ন্যায় আজকেও পত্রিকা পড়তে বসলো। পত্রিকায় তার পছন্দের অংশ হচ্ছে – সম্পাদকীয় বা কলাম প্রকাশের পাতা। পত্রিকায় সে আর কিছু পড়ুক আর না পড়ুক, এই অংশ তার পড়া চাই। আজকে তার একজন পছন্দের কলামিস্ট এর একটি লেখা পড়ছে। পড়ার মাঝে সে লক্ষ্য করলো কলামিস্ট তার আইফোনের প্রসংঙ্গ বার বার নিয়ে আসছেন এবং গুনগান গাইছেন। আইফোনের কিছু ভালো ভালো ফিচারের কথা বর্ণনা দিচ্ছে। যদিও আইফোনের কথা কিন্তু কলামের মূল বিষয়বস্তু নয়, তবুও কলামিস্ট সুনিপুন ভাবে আইফোনের ফিচারের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন।

তাহসিনের সাথে ঘটা ঘটনাটি আমাদের অনেকের সাথে ঘটে থাকে। আমরা কেউ বিষয়টি খতিয়ে দেখি না কেন এমন হয় বা এর উদ্দেশ্য কি। অনেকেই জানিনা এই রকম কন্টেন্টের মাঝে অন্যকে কত সহজে প্রমোট করা যায়। জানিনা এটিকে যে  বলা হয়ে থাকে ‘কন্টেন্ট মার্কেটিং’। আজকে আমাদের কন্টেন্টের বিষয়বস্তু ঠিক করেছি ‘কন্টেন্ট মার্কেটিং’ নিয়ে। 

কন্টেন্ট মার্কেটিং কি? 

কন্টেন্ট মার্কেটিং হচ্ছে একটি মার্কেটিং টেকনিক। কন্টেন্টের মাঝে মূল্যবান, বস্তুনিষ্ঠ এবং ধারাবাহিক উন্নত মানের তথ্য সংযুক্ত করা হয় শুধুমাত্র কন্টেন্টের অডিয়েন্স কে নির্দিষ্ট কিছু প্রোডাক্ট সম্পর্কে আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্যে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অডিয়েন্সকে লাভজনক কাস্টমারে রুপান্তর করাই হচ্ছে কন্টেন্ট মার্কেটিং। 

অনেকে এখন ও বিষয়টি সম্পর্কে  পরিষ্কার ধারণা নিতে পারেন নি। সমস্যা নেই আমরা আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো। চলুন তাহসিনের সাথে ঘটা ঘটনায় ফিরি। তাহসিন যে কলাম পড়েছিলো, সেটি ছিলো একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা বিশ্লেষণ। কিন্তু কলামিস্ট সেখানে আইফোনের কিছু গুনগান গাইলো। কিছু বিশেষ সুবিধার কথা বর্ণনা করলো। যা তাহসিনের মনে দাগ কাটলো। সে আইফোন সম্পর্কে কৌতুহল প্রকাশ করলো। 

এই যে তাহসিনের আইফোনের প্রতি কৌতুহল সৃষ্টি, এটি ছিলো কন্টেন্ট মার্কেটিং এর একমাত্র উদ্দেশ্য। কন্টেন্ট মার্কেটিং কে বলা হয়ে থাকে সবচেয়ে স্মার্ট মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি গুলোর একটি। এর মাধ্যমে সবচেয়ে বিশ্বস্ত কাস্টমার সৃষ্টি করা যায়। 

তাহসিনের কথাই ধরুন না, সে যার কলামটি পড়ছিলো, তিনি তাহসিনের নিকট অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। তার প্রিয় এই জ্ঞানীগুনী মানুষের কলমে জানা তথ্য তাহসিনের নিকট সবচেয়ে বিশ্বস্ত হবে এমন টাই স্বাভাবিক। আর এই বিশ্বস্ততার বিষয়টি মার্কেটাররা বুঝতে পেরে এটিকে একটি মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিতে রুপান্তর করে ফেলেছে। 

ফলফল হচ্ছে- তাহসিন আইফোনের অন্য সাধারণ এড এর তুলনায় এই এডটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন মনে করবে, এর মাধ্যমে মার্কেটিং এর উদ্দেশ্য ও হাসিল হবে। তাই কন্টেন্ট মার্কেটিং একটি স্মার্ট এবং রিলায়বল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি হিসেবে পরিচিত। 

কন্টেন্ট মার্কেটিং এর  ইতিহাস

কন্টেন্ট মার্কেটিং শুনতে মনে হয় রিসেন্ট আবিষ্কৃত হওয়া কোন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। শুরুতে আমিও এমন মনে করতাম। কিন্তু আমার ধারণা আসলে মোটেও ঠিক ছিলো না। কন্টেন্ট মার্কেটিং এর ইতিহাস জানলে আপনারাও হকচকিয়ে উঠতে পারেন। 

কন্টেন্ট মার্কেটিং সর্বপ্রথম ব্যবহার করে থাকেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিং এক মার্কিনী। তিনি ১৭৩২ সালে তার লিখিত ‘Poor Richard’s Almanack’ নামক বইতে একটি প্রিন্টিং প্রেসের মার্কেটিং করেছিলেন। তাই তার সেই অসাধারণ আইডিয়া রুপান্তরিত হতে হতে আজকের একবিংশ শতাব্দিতে সবচেয়ে স্মার্ট মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিতে রুপান্তরিত হয়েছে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্ককে বলা হয়ে থাকে কন্টেন্ট মার্কেটিং এর জনক। 

১৮৯৫ সালের দিকে John Deere নামের কোম্পানিটি  একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছিলো। যার নাম ছিলো ‘The Furrow’। এই ফাররো নামের ম্যাগাজিন টি তৎকালীন সময়ের কৃষকদের উদ্দেশ্যে করে লিখা হয়েছিল। এই মাগাজিনে স্থান পেয়েছে ‘কিভাবে কৃষকরা উপকৃত হতে পারে’ এই সম্পর্কিত তথ্য। 

এবার বলবো এই ম্যাগাজিনে কিভাবে কন্টেন্ট মার্কেটিং এর ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধি করেছে সেই গল্প। তাদের ম্যাগাজিনের হাতের বাঁ পাশে নিচের দিকে ছোট্ট করে লিখা ছিলো –”Sent to you with the compliments of your John Deere Dealer”। অনেকে ধারণা করে থাকেন এ আর কি চমকপ্রদ তথ্য, হয়তো আসলেই কমপ্লিমেন্টের জন্য জুড়ে দিয়েছিলেন এছাড়া আরকি। এক্ষেত্রে আপনাদের মার্কেটিং এর উদ্দেশ্য খুঁজতে যাওয়া বোকামি ছাড়া আরকি! 

হ্যাঁ, পাঠক আপনার মত অনেকেই চিন্তা করেন। আমিও চিন্তা করি আসলে হয়তো এমনি কোন কারণ ছাড়াই দিয়েছে তারা এই তথ্য। পরে জানতে পারলাম, আমার চিন্তা ভাবনা আসলে ভুল ছিলো। কারণ সেই সময়ে তারা এই কন্টেন্ট মার্কেটিং এর পাওয়ার সম্পর্কে অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছিল। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিলো এটির মাধ্যমে তাদের ব্রান্ডটি কৃষক দের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলা। কারণ তাদের কোম্পানির বেশির ভাগ প্রোডাক্টের প্রধান ভোক্তাকূল হচ্ছে এই কৃষক সমাজ। বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং না? 

এই দু’টো উদাহারণ যথেষ্ট কন্টেন্ট মার্কেটিং এর ইতিহাস কত সমৃদ্ধ তা সম্পর্কে ধারনা নেওয়ার। এই রকম অনেক বিশ্বাসযোগ্য ঘটনার প্রমান রয়েছে। কন্টেন্টের পরিধি বড় হয়ে যাবে সেই জন্য কথা বাড়াচ্ছি না, সময় অনেক গড়িয়েছে। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো মার্কেটিং প্রসিডিউর আর আগের মত নেই । এখন হয়েছে আরো স্মার্ট আরো কার্যকর। বর্তমানে ডিজিটাল মার্কেটিং এর বিশাল একটি অংশ জুড়ে রয়েছে এর বিস্তার এবং আধিপত্য। 

কেন কন্টেন্ট মার্কেটিং প্রয়োজন? 

কন্টেন্ট মার্কেটিং কি তা হয়তো কিছুটা বুঝতে পেরেছেন। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, কন্টেন্ট মার্কেটিং কি তা জানার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে, কন্টেন্ট মার্কেটিং কেন আপনার বিজনেসের জন্য গুরুত্বপূর্ন সেটি বুঝতে পারা। কিভাবে কন্টের মার্কেটিং এর মাধ্যমে সাধারণ রিডারকে বায়ারে রুপান্তর করে হয় সেটি বুঝতে পারা। আর এই সাধারণ রিডারকে কাস্টমারে রুপান্তর করতে ৪টি গুরুত্বপূর্ন ধাপ পার করতে হয়। সেগুলো হলো- 

সতর্কতা (Awareness) : সাধারন রিডারের মধ্যে এই পর্যায়ে প্রোডাক্ট সম্পর্কে ধারণা দিয়ে থাকে। ধারণা পেয়ে তাদের প্রোডাক্টটি সম্পর্কে কৌতুহল সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ে একজন কাস্টমার কিনবেন নাকি কিনবেন না, এই সম্পর্কে দ্বিধা দন্ধে থাকেন। মনস্থির করতেই এই পর্যায়ে সময় লেগে যায়। মূলত কৌতুহল সৃষ্টি করাই এই পর্যায়ের মূল উদ্দেশ্য। 

রিসার্চ (Research) :  যখন একজন সাধারণ রিডার কোন প্রোডাক্ট এর নাম শুনে থাকেন বা অল্প কিছু ধারণা পেয়ে থাকেন তখন তার কৌতুহল হয় প্রোডাক্ট টি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার। বিস্তারিত জানার উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনি হয়তো প্রোডাক্ট টি কিনবেন বলে মনে মনে ভাবছেন। ভাবনার বীজ সবে মাত্র বপিত হয়েছে। যখন ই কোন একজন কাস্টমার কোন কিছু কিনবেন বলে মনস্থির করে থাকেন, তখন তারা রিসার্স করা শুরু করে দেন। অর্থাৎ প্রডাক্ট সম্পর্কে ধারণা নিতে শুরু করেন। গুগল সার্চ করে থাকেন। যেমন- তাদের কোন আইফোন টি কেনা উচিত। কোনটি তারা এফোর্ড করতে পারবে এই পর্যায়ে তারা এটি সম্পর্কে বিচার বিশ্লেষন শুরু করেন। 

বিবেচনা (Consideration) : এই পর্যায়ে কাস্টমার সব তথ্য হাতে পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রোডাক্টের মাঝে তুলনা মূলক পার্থক্য সৃষ্টি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায় এটি। দাম থেকে শুরু করে কোন প্রোডাক্টটি তারা এফোর্ড করতে পারবে কিনা এই সবকিছুর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কোথায় সবচেয়ে সুলভ মুল্যে কিনতে পারবেন, সেই সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। অর্থাৎ কোন মডেলের আইফোন কিনবেন এবং কোথা থেকে কিনবেন এই সম্পর্কে ডিসিশন নিয়ে থাকেন। 

কেনা (Buy) : এই পর্যায়ে তারা তাদের পছন্দের প্রোডাক্ট টি কিনে নিয়ে থাকেন। সব সিদ্ধান্ত আগের পর্বেই শেষ করে আসেন। 

অর্থাৎ একটি পন্য সেল করাতে হলে রিডারকে এই পদ্ধতির মধ্যদিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর কন্টেন্ট মার্কেটিং এই বিষয়টিকে নিয়েই কাজ করে থাকে। 

কন্টেন্ট মার্কেটিং একটি স্মার্ট মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। সাধারণত ভোক্তারা বিষয়টি বুঝতে পারে না। তাহসিনের ঘটনাটাই দেখুন না। তাহসিনের মত করে কত শতাংশ চিন্তা করে থাকে? সবাই বুঝতে পারে না যে আসলে এটি কি উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। আমরা ফেসবুকে ও হরহামেশা এই ধরনের কন্টেন্ট দেখতে পাই। এদের মধ্যে কিছু আছে সাধারণ ইউজার। তারা নিজেরাও জানে না কিভাবে তারা একটা ব্রান্ডকে প্রমোট করে ফেলছে। এছাড়া বাদ বাকি যত মার্কেটার যারা আছে, তারা কিন্তু বিষয়টা বেশ ভালো ভাবে জানেন এবং বুঝে থাকেন।

 কথা বলছিলাম কেন কন্টেন্ট মার্কেটিং আপনার জন্য প্রয়োজন তা নিয়ে। কন্টেন্ট মার্কেটিং এর মাধ্যমে ভোক্তাদের কোন পন্যের প্রতি আকৃষ্ট করে নেওয়া যায় খুব সহজে। এই কন্টেন্ট মার্কেটিং এর বিশেষ জনপ্রিয়তা গড়ে উঠেছে – ভোক্তারা বেশিরভাগ ই মনে করে উঠতে পারেনা এটি মার্কেটিং এর উদ্দেশ্যে তৈরি, এজন্য।

এই মার্কেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে আপনি প্রথমে ইউজারদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারবেন। মানে তাদের কে প্রথমে প্রোডাক্টটি সম্পর্কে অবগত করাতে পারবেন। এর পরের ধাপ গুলো নিজে নিজে গ্রাহক আগের কন্টেন্টের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে সম্পন্ন করবে। সব শেষে মার্কেটারদের মিশন শেষ হবে  কাস্টমারকে কোন প্রোডাক্ট কিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। 

আজকে এই পর্যন্ত থাকুক। আগামী কোন একদিন কন্টেন্ট মার্কেটিং এর বিভিন্ন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা করবো। জানাবো কিভাবে কোকা-কোলা মাইক্রোসফট, হাবস্পট এর মত বড় বড় জায়েন্ট প্রতিষ্ঠান গুলো সফল হয়েছিলো এই মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করে সেই গল্প। সি পর্যন্ত ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। 

Leave a Comment